জাপানের অর্থনৈতিক প্রবৃদ্ধিতে শ্রম সংকট উল্লেখযোগ্য একটি বাধা। এর মধ্যে কম মজুরি ও অন্যান্য চ্যালেঞ্জের কারণে বিদেশী কর্মীরা ব্যাপকভাবে দেশটি ছাড়ছেন। এ অবস্থায় কোম্পানিগুলো তাদের ধরে রাখতে বাড়তি মনোযোগ দিচ্ছে। খবর জাপান টুডে।
প্রতিবেদনে উদাহরণ হিসেবে গুনমা প্রদেশের হিমায়িত খাদ্য প্রস্তুতকারক ও বিক্রেতা ইট অ্যান্ড হোল্ডিংস ইনকরপোরেটেডের প্রচেষ্টাকে সামনে আনা হয়। কোম্পানিটি বিদেশী শ্রমশক্তির ওপর ব্যাপক নির্ভরশীল।
বিদেশী কর্মীদের আসবাবসহ বাসা ভাড়া, জাপানি ভাষা শিক্ষা ও ক্যাফেটেরিয়ায় সাশ্রয়ী মূল্যে খাবারের ব্যবস্থা করেছে ইট অ্যান্ড হোল্ডিংস। এর মাধ্যমে নিরাপদ ও স্বাচ্ছন্দ্য কাজের পরিবেশ নিশ্চিত করতে চায় তারা।
কোম্পানির মানবসম্পদ বিভাগে কাজ করেন ভিয়েতনাম থেকে আসা এনগুয়েন থি কুইন ত্রাং। তিনি বলেন, ‘চিকিৎসা বা আর্থিক বিদেশী শ্রমিকদের যেকোনো সমস্যায় সাহায্য নিশ্চিত করি। সমস্যা শুরু হওয়ার আগেই তা সমাধান করতে চাই আমরা।’
কোম্পানিটি সাতটি দেশের ৩৭০ কর্মীকে সহায়তা দেয়। এর মধ্যে রয়েছেন কারিগরি শিক্ষানবিশদের জন্য ‘স্পেসিফায়েড স্কিলড ওয়ার্কার’ ভিসায় জাপানে যাওয়া বিদেশীরা। ২০১৯ সালে চালু হওয়া এ ভিসা পূর্ব প্রশিক্ষণ ছাড়াই নির্দিষ্ট কিছু খাতে কাজের অনুমোদন দেয়। তবে এ নিয়ে কিছু বিতর্ক রয়েছে।
ইট অ্যান্ড হোল্ডিংস বিভিন্ন বিভাগে বিদেশী কর্মীদের ভাতা দেয়। যেমন জাপানি ভাষার পরীক্ষায় উত্তীর্ণ হলে মাসিক ভাতা, বাড়ি ভাড়ায় আর্থিক সহায়তা ও খাদ্য ব্যয়ের জন্য সহায়তা।
জাপানে শ্রম সংকট তীব্র হওয়ায় ২০২৪ সালের জুনে একটি নতুন কর্মসূচির বিষয়ে আইন পাস হয়, যা বিতর্কিত বিদেশী প্রশিক্ষণ কর্মসূচির পরিবর্তে ২০২৭ সালের মধ্যে কার্যকর হবে। নতুন এ কর্মসূচির লক্ষ্য হলো দক্ষ বিদেশী কর্মী তৈরি ও তাদের নিরাপত্তা নিশ্চিত করা।
সম্প্রতি কঠোর কাজের পরিবেশ ও মানবাধিকার লঙ্ঘনের জন্য ব্যাপক সমালোচনার মুখে পড়ে জাপানের বিদেশী প্রশিক্ষণ কর্মসূচি। অনেক নিয়োগকর্তার বিরুদ্ধে সস্তা শ্রম নিশ্চিত করতে এ ব্যবস্থা অপব্যবহারের অভিযোগ উঠেছে।
২০২৪ সালের মার্চে নির্দিষ্ট দক্ষতাসম্পন্ন কর্মী ভিসার আওতায় কাজের ক্ষেত্র বাড়ানো হয়েছে। ওই বছরের এপ্রিল থেকে পরবর্তী পাঁচ অর্থবছরে জাপান ৮ লাখ ২০ হাজার বিদেশী নাগরিককে দক্ষ কর্মী ভিসার আওতায় সুযোগ দেয়ার পরিকল্পনা করছে, যা ২০২৩ অর্থবছর পর্যন্ত প্রাথমিকভাবে প্রস্তাবিত সংখ্যার তুলনায় দ্বিগুণেরও বেশি।
আগের তুলনায় বেশি কোম্পানি বিদেশী কর্মী নিয়োগের চেষ্টা করলেও কিছু বিষয় নিশ্চিত করার কথা বললেন কর্মীদের সাহায্য দেয় এমন প্রতিষ্ঠান মাইনাভি গ্লোবাল করপোরেশনের প্রেসিডেন্ট মোটোকি ইউজুরিহা। তার মতে, কর্মীদের চাকরিতে ধরে রাখার ইচ্ছাকে প্রভাবিত করতে পারে এমন বিষয়ে নিয়োগকর্তাদের সচেতন থাকতে হবে।
টোকিওভিত্তিক এ সংস্থা ২০২৪ সালের জুন পর্যন্ত এক বছরে তিনটি খাতের ৩৫০ দক্ষ বিদেশী কর্মীর ওপর দেশব্যাপী জরিপ চালায়। এতে দেখা যায়, ভিয়েতনামি কর্মীদের মধ্যে ‘মজুরিতে অসন্তুষ্টি’ চাকরি ছাড়ার প্রধান কারণ। ইন্দোনেশিয়া ও মিয়ানমারের কর্মীদের ক্ষেত্রে ‘মানবিক সম্পর্ক’ প্রধান কারণ হিসেবে উঠে আসে। বিশেষত জাপানি কর্মীদের সঙ্গে যোগাযোগের সমস্যাগুলো তাদের চাকরিতে থাকার ইচ্ছাকে উল্লেখযোগ্যভাবে প্রভাবিত করেছে।
জরিপে আরো দেখা যায়, বিদেশীদের ক্ষেত্রে কোনো কোম্পানিতে যোগ দেয়ার ১০-১২ মাস পর চাকরি ছাড়ার হার ছিল সর্বোচ্চ, ২৫ দশমিক ৪ শতাংশ। তবে পরবর্তী এক বছরে এটি উল্লেখযোগ্যভাবে কমে ১২ দশমিক ৬ শতাংশে নেমে আসে।
জরিপের ফল ইঙ্গিত করে মোটোকি ইউজুরিহা জানান, যদি কোম্পানিগুলো কর্মীদের ১২ মাস ধরে রাখতে সফল হয়, তারা সম্ভবত দীর্ঘদিন চাকরিতে থাকবেন। বিশেষ করে নিয়োগের প্রাথমিক পর্যায়ে বিদেশী কর্মীদের প্রয়োজনীয় সহায়তা দেয়ার গুরুত্ব তুলে ধরেন তিনি।
দক্ষ বিদেশী কর্মীদের ক্ষেত্রে ‘বিয়ে, সন্তান ধারণ বা নিজ দেশে পারিবারিক বিষয়’ও চাকরি ছাড়ার উল্লেখযোগ্য কারণ। মোটোকি ইউজুরিহার মতে, এ ধরনের বিষয়ে কোম্পানির পাশাপাশি সরকারের সাহায্য প্রয়োজন। যেমন বিদেশীদের জন্য উপযুক্ত শিক্ষা বা শিশু যত্ন সহায়তা দিতে পারে পৌরসভা।